নিউইয়র্ক, ২৮ জুলাই, ২০২৫: নিউইয়র্ক সিটির প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটনে আজ এক ভয়াবহ বন্দুক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন আমাদের একজন গর্বিত বাংলাদেশী সন্তান, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (NYPD)-এর সদস্য, ৩৬ বছর বয়সী দিদারুল ইসলাম। এই মর্মান্তিক ঘটনা কেবল নিউইয়র্কই নয়, সারা বিশ্বের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।

আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মিডটাউন ম্যানহাটনের ৩৪৫ পার্ক এভিনিউতে অবস্থিত একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে এই হামলা ঘটে। বন্দুকধারী, ২৭ বছর বয়সী শেন তামুরা, এমফোর-স্টাইলের রাইফেল নিয়ে ভবনে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।

বাংলাদেশের বীর সন্তান দিদারুল ইসলাম:

দিদারুল ইসলাম, একজন বাংলাদেশী অভিবাসী, সাড়ে তিন বছর ধরে NYPD-তে কর্তব্যরত ছিলেন। তিনি একজন ডেডিকেটেড অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ সেবার জন্য তিনি নিউইয়র্কবাসীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ঘটনার সময় তিনি অফ-ডিউটিতে থাকলেও, একটি নিরাপত্তা ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন। ভবনের লবিতে প্রবেশের সাথে সাথেই বন্দুকধারী প্রথমে দিদারুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়, যা তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণ হয়। তিনি অস্ত্রোপচারের সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ দিদারুল ইসলামকে “একজন বীর” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, “তিনি একজন বীরের মতোই জীবনযাপন করেছেন, এবং বীরের মতোই মৃত্যুবরণ করেছেন।” দিদারুল ইসলাম বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর দুটি ছোট ছেলে রয়েছে। তাঁর স্ত্রী আট মাসের গর্ভবতী, তাঁদের তৃতীয় সন্তানের আগমন আসন্ন ছিল। মেয়র এরিক অ্যাডামস উল্লেখ করেছেন যে, দিদারুল তাঁর বাবার একমাত্র পুত্র ছিলেন। তাঁর এই অকাল প্রয়াণ তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ঘটনার বিস্তারিত:

বন্দুকধারী শেন তামুরা লবিতে দিদারুল ইসলাম এবং একজন নারীকে গুলি করার পর ওপরের তলাগুলোতে প্রবেশ করে। সে আরও একজন নিরাপত্তা প্রহরী এবং একজন পুরুষকে গুলি করে। এরপর ৩৩তম তলায় উঠে আরও একজনকে হত্যা করে এবং সবশেষে নিজে আত্মহত্যা করে। এই হামলায় বন্দুকধারী সহ মোট চারজন নিহত হয়েছেন। একজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং আরও চারজন পালিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য আঘাত পেয়েছেন। হামলাকারীর উদ্দেশ্য এখনও স্পষ্ট নয়, তবে তার মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইতিহাস ছিল বলে জানা গেছে।

NYPD-তে বাংলাদেশী অফিসারদের ভূমিকা:

দিদারুল ইসলামের আত্মত্যাগ NYPD-তে কর্মরত অন্যান্য বাংলাদেশী অফিসারদের গুরুত্ব ও আত্মোৎসর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সেবা দিচ্ছেন, এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির সদস্যরাও এই পুলিশ ফোর্সের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যদিও NYPD-তে মোট কতজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অফিসার কর্মরত আছেন তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না, তবে এশিয়ান-আমেরিকান অফিসারদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। নিউইয়র্কের বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশী অফিসাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা শুধু অপরাধ দমনেই নয়, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষার কারণে স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে NYPD-এর সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করেন। দিদারুল ইসলামের শাহাদাত এই কমিউনিটির প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

এই কঠিন সময়ে আমরা শহীদ দিদারুল ইসলামের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের সকলের কাছে প্রেরণা হয়ে থাকবে।