দক্ষিণ লেবাননে অব্যাহত সহিংসতা এবং ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের ঘটনার মধ্যেই এই কূটনৈতিক চুক্তিটি হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই দিনের আলোচনার পর, ইসরায়েল ও লেবানন তাদের যুদ্ধবিরতি ৪৫ দিনের জন্য বাড়াতে সম্মত হয়েছে বলে শুক্রবার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ লেবাননে সাম্প্রতিক তীব্র সহিংসতা সত্ত্বেও এই চুক্তিটি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে ১৬ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট আশা প্রকাশ করেন যে, এই আলোচনা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার পূর্ণ স্বীকৃতি এবং উভয় দেশের সীমান্তে প্রকৃত নিরাপত্তা স্থাপনে সহায়ক হবে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুসারে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননের হারুফ শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন প্যারামেডিকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। একটি সিভিল ডিফেন্স সেন্টারে হামলার পর চতুর্থ একজন প্যারামেডিক ‘গুরুতরভাবে আহত’ হন। বুধবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আট শিশুসহ ২২ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল তার বিমান ও আর্টিলারি হামলা, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে, তীব্রতর করেছে এবং বলেছে যে তারা হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও তাদের পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে হিজবুল্লাহর হামলা প্রতিহত করার জন্য একটি বাফার জোন তৈরি করা। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক ও প্যারামেডিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ করেছে, যা ইসরায়েল অস্বীকার করেছে। হিজবুল্লাহও লেবানন এবং উত্তর ইসরায়েলে ইসরায়েলি সৈন্যদের উপর রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
এই সংঘর্ষের কারণে লেবানন জুড়ে দশ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ, পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকা এবং বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি থেকে এসেছে, যে এলাকাগুলোতে হিজবুল্লাহর প্রভাব রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননকে দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা হিজবুল্লাহর একটি প্রধান সমর্থন ঘাঁটি।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা জুনে ‘আলোচনার রাজনৈতিক ধারা পুনরায় শুরু করবে’। এছাড়াও, ২৯শে মে পেন্টাগনে একটি ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা’ শুরু হবে, যেখানে উভয় দেশের সামরিক প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লিটার এই আলোচনাকে ‘খোলামেলা এবং গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম ‘আলোচনায় আমাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য সমস্ত আরব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন একত্রিত করার’ আশা প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে এই সংঘাত শুরু হয়েছিল ২রা মার্চ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালানোর দুই দিন পর। এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ করে, যার ফলে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, তখন থেকে লেবাননে কমপক্ষে ২,৮৯৬ জন নিহত হয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ১৮ জন সৈন্য এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে।
সম্পর্কিত কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতি ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই পৃথক সংঘাত ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল এবং ৮ই এপ্রিল স্থগিত হয়েছিল, যা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসের অভাবই যুদ্ধ শেষ করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
আমরা আশা করি এই আলোচনা দুটি দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি, একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার পূর্ণ স্বীকৃতি এবং তাদের যৌথ সীমান্তে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
সূত্র
- BBC News — যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিবরণ, সাম্প্রতিক সহিংসতা, হতাহতের সংখ্যা, সরকারি বিবৃতি, সংঘাতের প্রেক্ষাপট, মানবিক প্রভাব, ভবিষ্যৎ আলোচনার গতিপথ।
- Indiatimes — ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিবৃতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানের ভূমিকা।
- France24 — যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর খবরের সত্যতা নিশ্চিতকরণ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি।
