ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গাজা শহরে একটি আবাসিক ভবন ও একটি গাড়িতে চালানো হামলায় তারা হামাসের সশস্ত্র শাখার সিনিয়র নেতা ইজ্জ আদ-দিন আল-হাদ্দাদকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
শুক্রবার রাতে গাজা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হামাস কমান্ডার ইজ্জ আদ-দিন আল-হাদ্দাদকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজা শহরে এক বিমান হামলায় তারা ইজ্জ আদ-দিন আল-হাদ্দাদকে হত্যা করেছে, যাকে তারা “৭ অক্টোবরের গণহত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী” হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেন, হাদ্দাদ “হাজার হাজার ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক এবং আইডিএফ [ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস] সৈন্যের হত্যা, অপহরণ ও আহত হওয়ার জন্য দায়ী” ছিলেন। হামাস তাদের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেডের কমান্ডার হাদ্দাদের নিহত হওয়ার দাবি নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।
বিমান হামলাগুলো রিমাল এলাকার আল-মু’তাজ নামে পরিচিত একটি আবাসিক ভবন এবং একটি বেসামরিক গাড়িতে আঘাত হানে। প্রত্যক্ষদর্শীরা BBC-কে জানিয়েছেন, দুটি ভিন্ন দিক থেকে একযোগে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভবনটিতে আঘাত করার পর একটি পালিয়ে যাওয়া গাড়িকে লক্ষ্য করা হয়। গাজায় Al Jazeera-এর সংবাদদাতা ইব্রাহিম আল খলিলি জানিয়েছেন, এই হামলায় অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর ফলে একটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, দুটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন। Al Jazeera-এর উদ্ধৃত সূত্র অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। বেসামরিক গাড়িতে হামলায় তিনজন এবং ভবনে হামলায় আরও চারজন নিহত হন। এ ঘটনায় অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
গাজা শহরের কেন্দ্রে অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে এই হামলার ফলে বড় ধরনের আগুন লেগে যায় এবং উদ্ধারকারী দলগুলো আহতদের সরিয়ে নিতে বাধার সম্মুখীন হয়। প্রত্যক্ষদর্শী এবং একটি স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বেসামরিক পোশাকে হামাসের সশস্ত্র সদস্যরা গুরুতর আহত এক ব্যক্তিকে পাশের একটি দরজা দিয়ে বের করে একটি গাড়িতে তুলে দেয়। অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার (০.৯ মাইল) দূরে গাড়িটিতে হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে। সূত্রগুলো ধারণা করছে, প্রাথমিক হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর হাদ্দাদকে ওই গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
এই সর্বশেষ ইসরায়েলি হামলাটি নাকবা’র ৭৮তম বার্ষিকীতে ঘটেছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া আনুমানিক ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনিকে স্মরণ করে এই দিনটি পালন করা হয়। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্র মাহমুদ বাসেল জানান, হামলার শিকার আবাসিক ভবনটিতে শত শত মানুষ বাস করত এবং কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছিল।
হামাসের সঙ্গে ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলের চালানো সর্বশেষ হামলা এটি। হামাস বারবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার অভিযোগ করেছে। ইসরায়েলি সরকার দাবি করে, তাদের হামাস সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার অধিকার রয়েছে এবং পাল্টা অভিযোগ করে যে, হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে নিরস্ত্র হতে অস্বীকার করছে।
নেতানিয়াহু এবং কাটজ দাবি করেন, হাদ্দাদ “হামাসকে নিরস্ত্র এবং গাজা উপত্যকাকে অসামরিকীকরণের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন চুক্তি বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করেছিলেন”। তারা আরও বলেন, “যারা ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও निर्णायक পদক্ষেপ অব্যাহত রাখব”। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে এবং পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো এখনও কার্যকর হয়নি।
দুই বছরব্যাপী গাজা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার মাধ্যমে, যেখানে প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় একটি সামরিক অভিযান শুরু করে, যেখানে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে ৭২,৭৪৪ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এদের মধ্যে ৮৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
“যারা ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও निर्णायक পদক্ষেপ অব্যাহত রাখব।”
সূত্র
- Al Jazeera — হতাহতের সংখ্যা এবং ইসরায়েলের দাবি সম্পর্কিত প্রধান তথ্য, Al Jazeera-এর পক্ষ থেকে খবরের সত্যতা যাচাই না করার বিষয়টি।
- BBC News — ইজ্জ আদ-দিন আল-হাদ্দাদের কথিত ভূমিকা, নেতানিয়াহু ও কাটজের যৌথ বিবৃতি, হামাসের পক্ষ থেকে নিশ্চিত না করা, হামলার প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ, যুদ্ধবিরতির বিবরণ, হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের যুক্তি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টা, ট্রাম্পের পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক সংঘাতের হতাহতের পরিসংখ্যান।
- Al Jazeera — হতাহতের বিবরণ (নারী, শিশু, আহত), চিকিৎসা সূত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও আগুন সম্পর্কিত Al Jazeera সংবাদদাতার প্রতিবেদন, ভবনের অবস্থান, নাকবা দিবসের প্রেক্ষাপট এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্রের বিবৃতি।
