সান দিয়েগো (যুক্তরাষ্ট্র), ১৮ মে ২০২৬ — যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগো শহরের বৃহত্তম মসজিদ ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে সোমবার এক বন্দুক হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন ছিলেন মুসল্লি ও একজন মসজিদের নিরাপত্তা প্রহরী। সান দিয়েগো পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে তারা আপাতত একটি বিদ্বেষমূলক হামলা হিসেবেই তদন্ত করছে।
হামলার কিছুক্ষণ পরই মসজিদ থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি গাড়ির ভেতরে দুই সন্দেহভাজন হামলাকারীর মরদেহ পাওয়া যায়। সান দিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াল জানিয়েছেন, নিহত হামলাকারীদের বয়স ১৭ ও ১৯ বছর এবং প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা দুজনেই নিজেদের গুলিতে আত্মহত্যা করেছেন। অভিযানে কোনো পুলিশ সদস্য গুলি ছোড়েননি বলেও তিনি জানান।
যেভাবে ঘটে হামলা
সোমবার স্থানীয় সময় বেলা প্রায় ১১টা ৪০ মিনিটে সান দিয়েগোর ক্লেয়ারমন্ট মেসা ইস্ট এলাকার একস্ট্রম অ্যাভিনিউয়ের ৭০০০ ব্লকে অবস্থিত মসজিদটিতে বন্দুকধারীর খবর পেয়ে পুলিশের কাছে প্রথম ফোন আসে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে কর্মকর্তারা মসজিদের বাইরে তিনজনকে মৃত অবস্থায় পান। বন্দুকধারী এখনো ভবনের ভেতরে থাকতে পারেন—এই আশঙ্কায় পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং কক্ষে কক্ষে তল্লাশি শুরু করে।
পুলিশপ্রধান ওয়াল জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মসজিদের ভেতরে ঢোকেন। এই অভিযান চলাকালেই কয়েক ব্লক দূরের আরেকটি স্থান থেকে ৯১১ নম্বরে ফোন আসতে শুরু করে। সেখানে এক বাগান-শ্রমিককে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছিল, তবে তিনি অক্ষত ছিলেন। ওই কলের পরপরই হ্যাটন স্ট্রিটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির ভেতরে দুই ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, তাঁরাই মসজিদে হামলা চালিয়েছিলেন।
দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিট নাগাদ পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল সক্রিয় থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। দুপুর ১টার পরপরই ঘোষণা আসে—হুমকি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হামলায় একটি সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে মসজিদের বাইরের রাস্তায় অন্তত দুটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
প্রাণ দিয়ে অনেক জীবন বাঁচালেন নিরাপত্তা প্রহরী
নিহত তিনজনের একজন ছিলেন ইসলামিক সেন্টারের নিরাপত্তা প্রহরী। পুলিশপ্রধান ওয়াল বলেন, তাঁর সাহসিকতাই হয়তো আরও অনেক বড় প্রাণহানি ঠেকিয়ে দিয়েছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘নিহতদের একজন এখানকার নিরাপত্তা প্রহরী, এবং পরিস্থিতি আরও অনেক ভয়াবহ হওয়া থেকে আটকানোতে তিনি অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।’’
মসজিদ চত্বরে অবস্থিত আল রশিদ স্কুলের সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। আল রশিদ স্কুলে আরবি ভাষা, ইসলামি শিক্ষা ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। সেন্টারটির পরিচালক ইমাম তাহা হাসান সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক আহত হননি। অভিভাবকদের সন্তান নিতে কাছাকাছি একটি গির্জাকে অস্থায়ী পুনর্মিলন কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
কেন বিদ্বেষমূলক হামলা হিসেবে তদন্ত
হামলার লক্ষ্য একটি মসজিদ হওয়ায় সান দিয়েগো পুলিশ ঘটনাটিকে শুরু থেকেই বিদ্বেষমূলক হামলা হিসেবে দেখছে। পুলিশপ্রধান ওয়ালের ভাষায়, ‘‘অন্য কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এটিকে একটি বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবেই তদন্ত করছি।’’ যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোনো হামলা যদি ভুক্তভোগীর ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত পরিচয় বা যৌন পরিচয়ের কারণে ঘটানো হয়, তবে তা ‘হেট ক্রাইম’ বা বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং সাজা আরও কঠোর হয়।
তিনি জানান, তদন্তে প্রয়োজনীয় সব সম্পদ নিশ্চিত করতে এফবিআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে স্থানীয় পুলিশ। ঘটনাস্থলে এসেছে এফবিআইয়ের সান দিয়েগো ফিল্ড অফিসের সদস্যরাও। এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে নিশ্চিত করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও হামলার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
হামলার মূল উদ্দেশ্য এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই হামলাকারীর পরিচয়ও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। ওয়াল বলেছেন, ইসলামিক সেন্টারের নিজস্ব নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজসহ তদন্তকারীদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণ থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
প্রশাসন, রাজনীতিক ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সান দিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়া বলেন, এই শহরে বিদ্বেষের কোনো জায়গা নেই। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোনো সম্পদের ঘাটতি না রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামের কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে যাচ্ছেন এবং প্রথম প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ওই এলাকার মার্কিন কংগ্রেস সদস্য সারা জ্যাকবস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ছাত্র, মুসল্লি ও পুরো ক্লেয়ারমন্ট সম্প্রদায়ের জন্য তিনি গভীরভাবে শোকাহত। তিনি বলেন, প্রার্থনা, উপাসনা ও পড়াশোনা—সবই যেন সবাই শান্তিতে করতে পারেন।
মার্কিন মুসলিম অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)-এর সান দিয়েগো শাখার নির্বাহী পরিচালক তাজিন নিজাম এক বিবৃতিতে এই ‘ভয়াবহ সহিংসতার’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নামাজে গিয়ে বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে কাউকেই যেন নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে না হয়। ইসলামিক সেন্টারের ইমাম তাহা হাসান বলেছেন, ‘‘একটি উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।’’ সব ধর্মের উপাসনালয়কে সব সময় সুরক্ষিত রাখা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
হামলার পরপরই সান দিয়েগোর আরেকটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান মুসলিম কমিউনিটি সেন্টার অব সান দিয়েগো দিনের জন্য সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে এবং মুসল্লিদের ঘরে থাকতে অনুরোধ জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে
এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক ঘটনার অভিযোগ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে কেয়ার। সংগঠনটির তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে সারা যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক আচরণ সংক্রান্ত ৮ হাজার ৬৮৩টি অভিযোগ তারা পেয়েছে—যা ১৯৯৬ সালে নাগরিক অধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করার পর থেকে এক বছরে সর্বোচ্চ।
কয়েক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগো সান দিয়েগো কাউন্টির বৃহত্তম মসজিদ। এটি ক্লেয়ারমন্ট এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের উপাসনা, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি কেন্দ্রবিন্দু।
পুলিশপ্রধান ওয়াল জানিয়েছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র—হামলাকারীদের গতিবিধি এবং তাঁরা কোনো বার্তা রেখে গেছেন কি না—আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রমাণ বিশ্লেষণের পর স্পষ্ট হবে। তাঁর ভাষায়, ‘‘অনেক তথ্য আর বিবরণ আমাদের সাজাতে হবে এবং এই ধাঁধার টুকরোগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে হবে।’’
সূত্র
- আল জাজিরা, ‘‘সন্দেহভাজন বিদ্বেষমূলক হামলায় সান দিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে ৩ জন নিহত’’ (১৮ মে ২০২৬)
- সিএনএন, ‘‘লাইভ আপডেট: সান দিয়েগোর বৃহত্তম মসজিদে গুলিতে নিহত ৩’’ (১৮ মে ২০২৬)
- এনবিসি ৭ সান দিয়েগো, ‘‘লাইভ আপডেট: সান দিয়েগো মসজিদে গুলিতে তিনজন নিহত, দুই হামলাকারী মৃত’’ (১৮ মে ২০২৬)
- সিবিএস ৮ সান দিয়েগো, ‘‘ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে গুলিতে দুই হামলাকারীসহ অন্তত পাঁচজন নিহত’’ (১৮ মে ২০২৬)
- ফক্স ৫ সান দিয়েগো / কেইউএসআই নিউজ, ‘‘ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে সক্রিয় বন্দুকধারীর খবরে পুলিশের সাড়া’’ (১৮ মে ২০২৬)
- এবিসি৭ / কেএবিসি, ‘‘ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে সক্রিয় বন্দুকধারীর খবরে পুলিশের সাড়া’’ (১৮ মে ২০২৬)
এই প্রতিবেদনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র সহায়তায় একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও সংকলন করে তৈরি। মূল তথ্য, উদ্ধৃতি ও পরিসংখ্যান প্রতিবেদনের নিচে উল্লেখিত সূত্রগুলো থেকে সংগৃহীত। প্রতিবেদনের সঙ্গে ব্যবহৃত মসজিদের ছবিটিও এআই-নির্মিত প্রতীকী ইলাস্ট্রেশন—ঘটনাস্থলের প্রকৃত আলোকচিত্র নয়। তথ্য যাচাই করা হয়েছে; কোনো অসঙ্গতি লক্ষ্য করলে অনুগ্রহ করে অবহিত করুন।
